ফাঁসির মঞ্চ থেকে সংসদে: বাবর ও আজহারুল ইসলামের চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চমকগুলোর একটি দেখিয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম। মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর খালাস পেয়ে তারা দুজনই এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
নেত্রকোনায় বাবরের বড় জয়
কারামুক্তির এক বছরের মাথায়ই নেত্রকোনা-৪ আসনে বিপুল ভোটে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বাবর। জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় উঠে এসেছেন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে টানা ১৭ বছর কারাগারে ছিলেন তিনি। বন্দী অবস্থায় ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ১৬ জানুয়ারি তিনি মুক্তি পান।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তুলনায় ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬১ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হন বাবর। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৮০১ ভোট, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৮৪০ ভোট।
রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন
১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তোলেন বাবর। পরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয়বার এমপি নির্বাচিত হন এবং চারদলীয় জোট সরকারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সে সময় তিনি ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা। ঢাকায় আওয়ামী লীগর সমাবেশে ভয়াবহ হামলার ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। এ ঘটনায় বাবর অভিযুক্ত হন এবং আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিএনপি দাবি করে, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রংপুরে আজহারুলের বিজয়
অন্যদিকে রংপুর-২ আসনে ৫৯ হাজার ৭৭০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮০ ভোট, আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯১০ ভোট।
ভোট গণনা শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাকে বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত ঘোষণা করেন। বিজয়ের পর তিনি বলেন, “এ বিজয় আমার নয়, জনগণের। ভোটাররা অন্যায় ও চাঁদাবাজির রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে।”
তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, যারা তাকে ভোট দেননি তাদের প্রতিও যেন সম্মান দেখানো হয় এবং ভবিষ্যতে তাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।
যুদ্ধাপরাধ মামলা ও খালাস
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আজহারুল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০১৯ সালে আপিল বিভাগ সেই রায় বহাল রাখে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের ২৭ মে সর্বোচ্চ আদালত রিভিউ শুনানি শেষে তাকে খালাস দেন।
এর আগে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ
মৃত্যুদণ্ডের রায়, দীর্ঘ কারাবাস, বিতর্কিত মামলা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংসদে প্রবেশ—বাবর ও আজহারুল ইসলামের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। তাদের নির্বাচনী বিজয় ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।


