রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থান করার পর দেশে ফিরে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
একসময় দুর্নীতির অভিযোগে দমন-পীড়নের মুখে পড়া এই ৬০ বছর বয়সী নেতা এখন দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি অবস্থায় নির্যাতনের পর চিকিৎসার প্রয়োজনে দেশ ছাড়েন তিনি। দীর্ঘ ১৬ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন।
আবেগঘন প্রত্যাবর্তন
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ তার ফেরাকে ঘিরে হাজারো নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। বিজয়ী প্রত্যাবর্তনের সেই মুহূর্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দেয়।
দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে শোক। তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর অসুস্থতার পর মৃত্যুবরণ করেন। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মাকে হারান তিনি।
তারেক রহমান বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক বংশের উত্তরসূরি। তার বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৭-১৯৮১ মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং ১৯৮১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। পরবর্তীতে খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নির্বাচনে রেকর্ড জয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেয়েছে ২০৬টির বেশি আসন—যা দলটির ইতিহাসে অন্যতম বড় জয়। তুলনামূলকভাবে ২০০১ সালে দলটি পেয়েছিল ১৯৩টি আসন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৩০টির বেশি আসন পেলেও পরবর্তী তিনটি নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ১১ দলীয় জোট থেকে বরাদ্দ ৩০ আসনের মধ্যে তারা পেয়েছে মাত্র ৬টি।
নীরব উদযাপন, বিশেষ দোয়ার ডাক
বিপুল জয়ের পরও বিএনপি কোনো বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় কল্যাণের জন্য শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হবে।
সামনে কোন পথে তারেক রহমান?
তারেক রহমান নিজেকে কেবল রাজনৈতিক উত্তরসূরি নয়, বরং ‘গণতন্ত্র পুনর্গঠনের নেতৃত্ব’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তিনি গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার, পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিন্যাস, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর সহায়তা ও নতুন শিল্পায়নের পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
তার এই আকস্মিক উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নও তুলেছে। তরুণদের নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের ঢেউ দেখা গিয়েছিল, তা ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়নি। আবার দুই দলের আধিপত্যের পুরোনো কাঠামোয় বিএনপির এ জয়কে অনেকে ‘প্রত্যাবর্তন’ হিসেবেই দেখছেন।
সব মিলিয়ে ২০২৪-২০২৫ সালের এই রাজনৈতিক অধ্যায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্র নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স


